বুধবার । ১১ই মার্চ, ২০২৬ । ২৬শে ফাল্গুন, ১৪৩২

জুলাই সংস্কারের পুরো প্যাকেজ বাস্তবায়ন চাই : জামায়াত আমির

গেজেট প্রতিবেদন

জামায়াতে ইসলামীর আমির ও বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, খণ্ডিতভাবে ডেপুটি স্পিকারের প্রস্তাব নয়, জুলাই সংস্কারের পুরো প্যাকেজ বাস্তবায়ন চাই।

তিনি বলেন, দেশের ভোট প্রয়োগ করা ৬৯ ভাগ মানুষ গণভোটে সংস্কারের পক্ষে রায় দিয়েছে। এটাকে অগ্রাহ্য করার কোনো সুযোগ নেই। চব্বিশকে বাদ দিয়ে ছাব্বিশের অস্তিত্ব থাকবে না বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

বুধবার (১১ মার্চ) দুপুরে জাতীয় সংসদের এলডি হলে বিরোধীদলীয় সংসদ সদস্যদের বৈঠক শেষে আয়োজিত প্রেস ব্রিফিংয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি এসব কথা বলেন।

বিরোধীদলীয় নেতার সভাকক্ষে জামায়াত আমির ও বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমানের সভাপতিত্বে ১১ দলীয় ঐক্যের সংসদ সদস্যদের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এতে বিরোধীদলীয় উপনেতা ডা. সৈয়দ আব্দুল্লাহ মো. তাহের, বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলামসহ অন্য সংসদ সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।

সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে জামায়াত আমির বলেন, ডেপুটি স্পিকারের বিষয়ে সরকারের পক্ষ থেকে নন-অফিশিয়ালি যোগাযোগ করা হয়েছে, এজন্য তাদেরকে ধন্যবাদ জানাই।

তবে আমরা চাই, জুলাই সংস্কার প্রস্তাব পুরোপুরি বাস্তবায়ন হোক। এর আলোকে বিরোধীদলের যতটুকু পাওনা ততটুকুই চাই, এর বেশি নয়। ওই প্রস্তাবেই আছে যে, একজন ডেপুটি স্পিকার বিরোধীদল থেকে হবে। আমরা খণ্ডিতভাবে এটা চাচ্ছি না। আমরা চাই প্যাকেজ। আমরা চাই, পুরোটাই সেখানে গ্রহণ হোক, বাস্তবায়ন হোক। এর ভিত্তিতেই যেন আমরা ন্যায্য দায়িত্বটা পালন করতে পারি। আরেক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, কাল (বৃহস্পতিবার) আমাদের ভূমিকা দেখবেন। ভাষণ শুনবেন।

বৈঠকের উদ্দেশ্য তুলে ধরে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, জাতির প্রত্যাশা পূরণে বিরোধীদল ও নির্বাচিত সংসদ সদস্য হিসেবে দেশ ও জাতির জন্য আমাদের ভূমিকা কী হবে, সে ব্যাপারে পরামর্শের জন্যই আমরা বসেছিলাম। আমাদের জোটের সব এমপি সেখানে উপস্থিত ছিলেন। খোলামেলা কথা বলেছি, মতামত নিয়েছি, পরামর্শ নিয়েছি।

স্বৈরাচারের দোসর রাষ্ট্রপতির সংসদে ভাষণ দেওয়ার অধিকার নেইস্বৈরাচারের দোসর রাষ্ট্রপতির সংসদে ভাষণ দেওয়ার অধিকার নেই

তিনি বলেন, আমরা চাই জাতীয় সংসদ দেশ ও জাতির জন্য অর্থবহ বা কার্যকর ভূমিকা পালন করুক। ইতোমধ্যে আমরা ঘোষণা করেছি যে, জাতীয় সংসদে আমরা একটি দায়িত্বশীল বিরোধীদল হিসেবে ভূমিকা পালন করতে চাই। সকল ব্যাপারে বিরোধিতা নয়, আবার না বুঝেও সহযোগিতা নয়। দেশ ও জাতির কল্যাণে সরকারের গৃহীত সকল পদক্ষেপে আমাদের সমর্থন-সহযোগিতা থাকবে। কিন্তু দেশ ও জাতির ক্ষতিকর কোনো সিদ্ধান্ত বা পদক্ষেপ নিলে আমরা আমাদের দায়িত্ব সেভাবেই পালন করব।

তিনি বলেন, প্রথমে ভুল করলে আমরা ভুল ধরিয়ে দেব, সংশোধনের সুযোগ দেব, পরামর্শ দেব। পরামর্শে কাজ না হলে প্রতিবাদ করব, প্রতিবাদে কাজ না হলে জনগণের অধিকারের পক্ষে আমরা শক্ত হয়ে দাঁড়াব। আমরা চাই, প্রথমটারই কাজ হোক। দ্বিতীয়, তৃতীয় বা চতুর্থটার কোনো প্রয়োজন যেন না হয়। এটা সম্পূর্ণভাবে নির্ভর করবে সরকারের সদিচ্ছার ওপর। যেহেতু তারা সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠ। সংখ্যাগরিষ্ঠতার বলে তারা কিছু করতে চাইলে পারবে। কিন্তু আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে যৌক্তিক বিষয়গুলোকে বিবেচনায় নিয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলে তা হবে জাতির জন্য উত্তম।

জামায়াত আমির বলেন, এই সংসদটা হঠাৎ করে এভাবে হয়নি। এটা একটা বিশেষ প্রেক্ষাপটে হয়েছে। বাংলাদেশের প্রথম জাতীয় সংসদ তার মেয়াদ পূর্ণ করতে পারেনি। দ্বিতীয়, তৃতীয় ও চতুর্থটাও পারেনি। স্বাধীনতার পর ১৯৯১ সালের সংসদ প্রথম মেয়াদ পূর্ণ করে। পরে ১৯৯৬, ২০০১ ও ২০০৮ সালের সংসদ পূর্ণ মেয়াদ পূরণ করে। বাকিগুলোর কোনো নৈতিক বৈধতা ছিল না।

তিনি বলেন, এবারের নির্বাচন তো ছাব্বিশে হওয়ার কথা ছিল না। সংবিধান মানলে নির্বাচন হওয়ার কথা ঊনত্রিশ সালে। চব্বিশের কারণে ছাব্বিশে হয়েছে। চব্বিশের সীমাহীন ত্যাগ এবং তিতীক্ষার পর অসংখ্য জীবনের বিনিময়ে, অসংখ্য আহত-পঙ্গুত্ত্ব বরণের মধ্য দিয়ে এবং টানা সাড়ে ১৫ বছর বিপুল সংখ্যক মানুষের জীবনদান, খুন, রক্ত, আয়নাঘরের বিনিময়ে, জেল-জুলুলম ও দেশান্বরিত হওয়ার বিনিময়ে চব্বিশ সংঘটিত হয়েছে। আমরা ৪৭, ৭১, ৫২, ৯০-জাতির এই টার্নিং পয়েন্টগুলোকে যেমন ধারণ করি, আমরা সিরিয়াসলি চব্বিশকেও ধারণ করি। বৈষম্যহীন ইনসাফের একটি সমাজ প্রতিষ্ঠার জন্য এই চব্বিশ হয়েছে।

ডা. শফিকুর রহমান বলেন, এবার জাতীয় নির্বাচনের সঙ্গে সংস্কারের জন্য গণভোট হয়েছে। যে অর্ডিনেন্সের কারণে এই নির্বাচন, একই কারণে গণভোটও হয়েছে। ফলাফল যেটা হয়েছে, সবাই দেখেছেন। আমরা দেশের বৃহত্তর স্বার্থে এই ফলাফল মেনে নিয়েছি। দুটো ফলাফলই মেনে নিয়েছি।

তিনি বলেন, একটি নির্বাচনকে আলাদা করে দেখার সুযোগ নেই। এই দুটি নির্বাচন একটি আরেকটার অংশ। বরং নির্বাচিত সদস্যদের প্রথম কাজ শুরু হবে সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে এবং তার কিছু মেয়াদ উল্লেখ রয়েছে। এই কাজটি সম্পন্ন হওয়ার পর তারাই আবার স্বয়ংক্রিয়ভাবে সংসদ সদস্য হিসেবে কাজ শুরু করবেন। এজন্য একই অর্ডিনেন্সকে সম্মান করে আমরা প্রথম দিনেই দুটি শপথ নিয়েছি। প্রথম শপথ হয়েছে, সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে এবং দ্বিতীয়টি হয়েছে সংসদ সদস্য হিসেবে। আমরা দুই জায়গায় শপথ নিয়েছি এবং দুই জায়গায় স্বাক্ষর করেছি।

কিন্তু দুঃখের বিষয়, সরকারি দল এখন পর্যন্ত প্রথম শপথটি নেয়নি। আমরা তাদের প্রতি আহ্বান জানাব-আসুন জুলাইকে সম্মান করি। জুলাইকে সম্মান করলে, চব্বিশ থাকলে ২৬ থাকবে; না হলে ছাব্বিশের অস্তিত্ব থাকে না। চব্বিশকে অমান্য, অগ্রাহ্য করে, পাশ কাটিয়ে ছাব্বিশ এ জাতির জন্য কোনো সুখবর নয়। আশা করি, তারা এই শপথ নিয়ে কাজটি দ্রুত সম্পন্ন করবেন। তাহলেই চব্বিশের এত শাহাদাত, জীবনদান, এত পঙ্গুত্ব, এত আহত-তার স্বার্থকতা পাবে। দেশের ভোট প্রয়োগ করা ৬৯ ভাগ মানুষ এর পক্ষে রায় দিয়েছে। এটাকে অগ্রাহ্য করার কোনো সুযোগ নেই।

তিনি বলেন, আমরা এর পক্ষে ভূমিকা রেখে যাব এবং আমরা চাইব, যে চারটি বিষয় গণভোটে দেওয়া হয়েছিল তার সবগুলো হুবহু গ্রহণ করা হোক, বাস্তবায়ন হোক। আমাদের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে সর্বাত্মক সহযোগিতা থাকবে ইনশাআল্লাহ। অধিবেশন শুরু হলে আরো যেসব বিষয় প্রসঙ্গক্রমে আসবে, এই বিষয়গুলো নিয়ে আমরা আলোচনা করছি। আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি যে, আমরা অবশ্যই অপ্রাসঙ্গিক কোনো ভূমিকা রাখব না, প্রাসঙ্গিক ভূমিকা রাখব।

তিনি বলেন, আমরা আগেই বলেছি-বিরোধিতার জন্য বিরোধিতা নয়, সহযোগিতা করতে হলে সেটা দেশ এবং মানুষের জন্য আর বিরোধিতাও করতে হলে দেশ এবং মানুষের অধিকারের জন্য। এ লড়াই ইনশাআল্লাহ আমরা সংসদে করব। প্রয়োজনে এ লড়াই রাজপথেও হবে। এটা গণতন্ত্রের সৌন্দর্য্য। আমরা এসব বিষয় নিয়ে হুটহাট করে আদালতে যাওয়াটা আমরা সহজে দেখব না। একান্ত বাধ্য হলে আমরা হয়তো কোনো কোনো বিষয়ে আদালতের আশ্রয় নেব। আমরা প্রথমেই এসব প্রেডিক্ট করতে চাই না।

জামায়াত আমির বলেন, আমরা চাই, সব ব্যাপারে সংসদের অভিভাবক-স্পিকার ইনসাফ করবেন, বিরোধীদলকে যথেষ্ট সুযোগ দেবেন। তাহলে গণতন্ত্রের সৌন্দর্য্য শুধু ফুটে উঠবে না, গণতন্ত্র টেকসই হবে। যেটা এখনো বাংলাদেশ পায়নি। ত্রয়োদশ সংসদের মাধ্যমে মানুষ যেন সেটা পায়-সেই প্রত্যাশা করি। দায়িত্বশীল বিরোধীদল হিসেবে যাতে দায়িত্ব পালন করতে পারি, সেই সহযোগিতা ও দোয়া কামনা করি। আমরা ভোটারদের কাছে কৃতজ্ঞ। দেশবাসীকে মোবারকবাদ জানাই। চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানে অংশগ্রহণকারী সবাইকে কৃতজ্ঞতা জানাই।

তিনি বলেন, আমরা প্রবাসীদের ভোটাধিকারের জন্য কাজ করেছি। আশা করি, আগামীতে এই অধিকার আরো প্রতিষ্ঠিত হবে। তাদের ন্যায্য পাওনা যাতে পায়, সেজন্য আমরা লড়ে যাব। আমরা দেশের মানুষের কল্যাণ, ভালো চাই। সবাই মিলে এই দেশকে সুন্দর করব।

ডা. শফিকুর রহমান বলেন, আমরা আশা করব দুর্নীতি আর দুঃশাসনের করালগ্রাসে বাংলাদেশ নতুন করে আর পড়বে না। যদিও সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে দুর্নীতি এখনো প্রবাহিত হচ্ছে। ইতোমধ্যে সরকারের বেশ কিছু পদক্ষেপ জনগণের কাছে গ্রহণযোগ্য হয়নি। আমরা আশা করব, জনআকাঙ্ক্ষা বিশেষ করে জুলাইয়ের আকাঙ্ক্ষাকে ধারণ করে সরকার তার কার্যক্রম গ্রহণ করবে এবং দেশ ও জাতিকে উপকৃত করবে। এর পক্ষে আমাদের অবস্থান স্পষ্ট এবং এই অবস্থান অব্যাহত রাখব।

খুলনা গেজেট/এমএনএস




আরও সংবাদ

খুলনা গেজেটের app পেতে ক্লিক করুন